অভিযানের জেরে বদলে গেছে রাজনীতির দৃশ্যপট

Posted by

মাদক, চাঁদাবাজি, জুয়া-ক্যাসিনোর হোতাদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরুর পর থেকেই রাতারাতি বদলে গেছে রাজধানীর অলি-গলি, রাজপথের রাজনীতির চিরাচরিত দৃশ্যপট। আগে রাত-দিন এসব অলি-গলিতে ছাত্রলীগ, যুবলীগ নামধারী ক্যাডারদের হৈ-হুল্লোড়, মহড়ায় সাধারণ মানুষকে থাকতেন তটস্থ। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে গত কয়েকবছর অলি-গলির এসব কার্যালয় রঙিন আলোর ঝলসানিতে রঙিন হলেও শনিবার প্রধানমন্ত্রী ৭৩তম জন্মদিন চলে গেলো ভিন্ন দৃশ্যপটে। অবস্থা পাল্টে গিয়ে এসব কার্যালয় তালাবদ্ধ। ভিড় নেই নেতা-কর্মীর। শুনসান নিরবতা বিরাজ করছে সপ্তাহ খানেক আগেও মুখর থাকা এসব আড্ডার জায়গা।

সরেজমিন দেখা গেছে, সপ্তাহ খানেক আগেও এই মহানগরীর প্রতিটি গলি মুখে যেখানে সারাক্ষণ দেখা যেত সরকারদলীয় বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের জটলা, এখন সে দৃশ্য আর নেই বললেই চলে। বড় বড় নেতার মুভমেন্টে দেখা যেতো নামধারী সাঙ্গ-পাঙ্গদের। তাদের এখন আর দেখা যাচ্ছে না। শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে বোল-বাজির মতো উবে গেছে এসব চিত্র। বদলে গেছে দৃশ্যপট।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, টানা তিনবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকায় দলটিতে অনেক সুযোগসন্ধানী ও সুবিধাবাদী অনুপ্রবেশ করেছে। তারা নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে টাকা কামানোর ধান্ধা নিয়েই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনে অনুপ্রবেশ করেছে। এদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিরুদ্ধে দল ও সরকার প্রধানের কাছে বিভিন্ন সংস্থা থেকে বিস্তারিত তথ্য আছে। সেই তথ্যর ভিত্তিতেই সরকারে উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক এসব দূবৃর্ত্তদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করছে। পরিস্থিতি সহনীয় না হওয়া পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তারা জানান।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত দূর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি জঙ্গিদের যে পন্থায় দমন করা হয়েছে ঠিক সেই পন্থায়ই এসব দূর্বৃত্তদের দমন করারও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

ঝড়ের শুরু ছাত্রলীগের দুষ্কর্মকারী সভাপতি-সম্পাদক যথাক্রমে শোভন-রাব্বানীর আমলনামায় হাত দিয়ে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের বিপথগামীদের দুষ্কর্মে এর আগেও ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার তিনি অ্যাকশনে গেছেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে। আর প্রধানমন্ত্রীর এ হুঁশিয়ারির পরপরই মূলত আইন-শঙ্খলা বাহিনী হঠাৎ নেড়েচড়ে বসে। শুরু হয় অভিযান।

অভিযানের শুরুর দিনই রাজধানীর গুলশান থেকে বিপুল টাকা, অস্ত্র, মদ ও অন্যান্য মাদকসহ র‌্যাবে জালে আটকা পড়ে মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। খালেদের পর নিকেতন থেকে আটক হয় যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায় বিষয়ক সম্পাদক জি কে শামীম। এরপর মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় হানা দিয়ে কোটি কোটি টাকা, জুয়া-ক্যাসিনোর সরঞ্জাম, মদ ও মাদকসহ অনেককে আটক করে র‌্যাব। অভিযান শুরুর দিন থেকেই যুবলীগের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত মহানগর দক্ষিণ সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট তার কাকরাইলের কার্যালয়ে প্রায় হাজার খানেক নেতা-কর্মী ও বিশ্বস্ত দেহরক্ষী নিয়ে অবস্থান নেন। শুরু হয় কানাঘুষা। কখন সম্রাট আটক হচ্ছে- সেই কৌতুহল ভর করে সাধারণ মানুষের মনে।সুবিধাজনক সময়ে সম্রাট তার কার্যালয় থেকে লাপাত্তা হয়ে গেলে এখন কাকরাইলের ভূঁইয়া ম্যানশনের সেই কার্যালয়টি কার্যত শুনসান অবস্থা বিরাজ করছে।

কিন্তু মাত্র সপ্তাহ খানেক আগেও কাকরাইলের ভূঁইয়া ম্যানশনের এ যুবলীগের আস্তানাকে কেন্দ্র করে পুরো কাকরাইল এলাকা কার্যত মুখর থাকতো। সম্রাটের কার্যালয়ের সামনে তো বটেই আশপাশজুড়ে কখনও কখনও শ’খানেক মোটর সাইকেল, প্রাইভেটকার ও কয়েকশ নেতা-কর্মীতে মুখর থাকতো। অভিযান শুরুর পর থেকে এ চিত্র আর দেখা যাচ্ছে না।

রাজধানীর সেগুনবাগিচার সিটি করপোরেশনের কাঁচাবাজারের পশ্চিম পাশে কাস্টমস বন্ডের অফিসের সামনে আগে প্রতিদিন দেখা যেত শতাধিক মোটর সাইকেলের বহর। বিকাল থেকে রাজনীতির ছোটভাইদের সেখানে হাজির হওয়া নিত্য ঘটনা। এসব ছোটভাইরা বড় ভাইকে রাত ১২টা/একটা পর্যন্ত প্রটোকল দিত। জানা যায়, সেই ভাগ্যবান বড় ভাইটি হচ্ছেন ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগ দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের আহমেদ। সন্ত্রাসী ও গডফাদারদের বিরুদ্ধে পুলিশ-র‌্যাবের অভিযান শুরুর পর থেকে এ বড়ভাইয়ের আর প্রটোকল লাগছে না। এখন আর বড়ভাইকে প্রটোকল দিতে আসতে দেখা যাচ্ছে না ছোটভাইদের।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে যুবলীগের অফিসটি তালাবদ্ধ অবস্থায় আছে। যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ বলেন, এখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পর্যবেক্ষণ করছেন তারা। ফৌজদারি অপরাধে কেউ গ্রেফতার হলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান অভিযানের কারণে কে কোথায় আছেন, তা এখন বলা মুশকিল।

চলমান এই অভিযানের মধ্যে যুবলীগ, বিভিন্ন ওয়ার্ডের ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের অনেক নেতা গা ঢাকা দিয়েছেন বলে সংগঠনটির একাধিক নেতা দৈনিক জাগরণকে জানিয়েছেন।