ভ্যানচালক থেকে কোটিপতি কে এই ‘পলিথিন আলী’

Posted by

আলী হোসেন সরকার। ২০ বছর আগে বাবার সঙ্গে সিলেটে আসেন। তখন বাবা-ছেলে দুজনই ভ্যানগাড়ি চালাতেন। একসময় পেশা পরিবর্তন করে অবৈধ পলিথিন, ভেজাল জর্দা সিগারেটসহ বিভিন্ন নকলপণ্য বিক্রি শুরু করেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

অবৈধ পলিথিন আর ভেজাল পণ্য বিক্রি করে ভ্যানচালক থেকে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন আলী হোসেন।

সিলেট নগরীতে গড়ে তুলেছেন ডুপ্লেক্স বাড়ি। চড়েন প্রাডো গাড়িতে। এছাড়াও রয়েছে ৩টি প্রাইভেট কার। তিনি আবার একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক।

এসব যানবাহনে পত্রিকার স্টিকার লাগিয়ে নকলপণ্য বাজারজাত করছেন প্রশাসনের নাকের ডগায়। অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে কামিয়েছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।

যুগান্তরের আড়াই মাসের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য।

আলী হোসেনের বাড়ি সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে। তার বাবার মুজিবুর রহমান। আসল নাম আলী হোসেন হলেও ‘পলিথিন আলী’ হিসেবেই তিনি সিলেট ও আশপাশের এলাকায় পরিচিত তিনি।

আলী হোসেন সরকার নগরীর ১৪নং ওয়ার্ড কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মহানগর কৃষক দলের অর্থ সম্পাদক। তবে আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার আশীর্বাদ নিয়ে ও তার ভাতিজি-জামাই পরিচয় দিয়ে ‘ব্যবসায়’ প্রভাব দেখিয়ে চলেন তিনি।

স্থানীয়রা জানান, এক সময় লালদীঘির পাড়ের এক ব্যবসায়ীর হাত ধরে প্রশাসনিক জগতে পরিচয় ঘটে আলীর। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। সিলেটের বিভিন্ন স্থানে ভেজালপণ্যের কারখানা রয়েছে তার।

লালদীঘির পাড় ও হকার্স মার্কেটের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাসিক চুক্তির মাধ্যমে পলিথিন সাম্রাজ্যের একক আধিপত্য গড়ে তুলেছেন আলী। সুযোগ বুঝে অন্যান্য অবৈধ ব্যবসার বিস্তার ঘটান।

সেই সঙ্গে চলে তার সম্পাদিত ও প্রকাশিত অনিয়মিত জাতীয় ‘দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়া’র নামে বিভিন্ন স্থান থেকে চাঁদা আদায়। প্রতিনিধি কার্ড ও বিভিন্ন মোটরসাইকেল ও সিএনজিতে পত্রিকার স্টিকার লাগিয়ে মাসোহারা বাণিজ্য চলছে।

২০১৪ সালের ১৩ জুলাই ব্যবসায়ীদের অভিযোগের ভিত্তিতে লালদীঘির পাড় হকার্স মার্কেট থেকে নকল জর্দা কারখানার চার কর্মচারীসহ আলীকে গ্রেফতার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

তার দেয়া তথ্যে দক্ষিণ সুরমার ফকিরেরগাঁও হাজী আবুল কালাম কমিউনিটি সেন্টারের একটি ঘরের ভেতর থেকে বিপুল পরিমাণ নকল মমো জর্দা ও প্যাকিং মেশিন জব্দ করা হয়।

পরের বছরের ২৩ এপ্রিল আওয়ামী লীগ নেতা ছড়ারপারের আবুল কালাম তার কর্মকাণ্ড তুলে ধরে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। ২০১৮ সালের ২০ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে পুলিশ কমিশনার বরাবর আরও একটি লিখিত অভিযোগ করেন ব্যবসায়ী সামছুল ইসলাম ডিস্কো।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘মমো’ জর্দাকে নকল করে ‘মেমো’ নাম দিয়ে বাজারজাত করছেন আলী। এছাড়া তিনি মা কোম্পানির নামে অবৈধভাবে বাজারজাত করছেন ‘মা’ ও ‘ভিআইপি’ নামে চাপাতা, আটা, ময়দা, ধনিয়া, মরিচ ও হলুদের গুঁড়া, হাকিমপুরী জর্দা, গোপাল ১৩২ জর্দা, ফর্টিফাইড সয়াবিন তেল, কিশোরী সয়াবিন ও সরিষার তৈল, রকেট জর্দা, চন্দন ও ঝড় মশার কয়েল, কসমেটিক্সসহ ২৭টি আইটেম।

মেমো জর্দায় নিজের ছবির সঙ্গে লেখা- ‘মেমো জর্দা স্বাদই আলাদা, মো. আলী হোসেন সরকারের ছবি দেখে খরিদ করুন। নকল থেকে সাবধান।’ অধিকাংশ পণ্যের গায়ে আলীর ছবি সংযুক্ত, রয়েছে বিএসটিআইয়ের স্টিকারও। এসবে লেখা আছে মা কোম্পানির ঠিকানা- বিসিক শিল্পনগরী খাদিমনগর, প্লট-৫৯, সিলেট।

গেল বছরের ১৩ অক্টোবর খাদিমনগর বিসিকে গিয়ে ৫৯নং প্লটে মা কোম্পানির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এস-৯ নম্বর প্লটে মা কোম্পানি ও দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়ার সাইনবোর্ড রয়েছে। তবে দোতলা ওই ভবনটি বন্ধ দেখা গেছে।

পাশের প্রতিষ্ঠানের গার্ড কাজল জানান, দুই মাস বন্ধ রয়েছে ভবনটি। প্লটের পেছনে নির্মাণাধীন ভবনে কর্মরত রাজমিস্ত্রি সাইদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দু’মাস এখানে কাজ করছি। মা কোম্পানির গেট একদিনও খুলতে দেখিনি।

বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা শেখ ফজলুল হক যুগান্তরকে জানান, সিলেটের কোনো বিসিকে ‘মা কোম্পানি বা মা কেমিক্যাল কোম্পানির’ নামে কোনো প্লট নেই। এস-৯ প্লটে মা কোম্পানির সাইনবোর্ডের ছবি দেখালে তিনি বলেন, রয়েল ফুড কোম্পানির নামে সৈয়দ আহমদ মুনসুরের স্ত্রী শামীম আরা চৌধুরী প্লটটি বরাদ্দ নিয়েছেন।

বিসিকের উপ-মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ বখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি উল্টো সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেন যুগান্তরের পক্ষ থেকে তাদের এসব অপকর্মের খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।

পরে এক প্রশ্নের জবাবে বখতিয়ার উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, সপ্তাহখানেক আগেও এসব বাদ দিয়ে যে নামে প্লট বরাদ্দ নেয়া হয়েছে সেই কোম্পানি চালু করার জন্য বুঝিয়েছি। এখন নোটিশ করব, না মানলে আবার বাতিল করব।

বিএসটিআই সিলেটের আঞ্চলিক প্রধান প্রকৌশলী শাহাদৎ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বিএসটিআইয়ের ১৯৪টি পণ্যের মধ্যে জর্দা নেই। সুতরাং কোনো জর্দার লেবেলে বিএসটিআইর স্টিকার কেউ ব্যবহার করলে সেটা অবৈধ।

বিএসটিআই সিলেটের ফিল্ড অফিসার (সিএম) রকিবুল হাসান রিপন যুগান্তরকে জানান, মো. আলী হোসেন সরকারের নামে ২০১৮ সালের শেষদিকে মা কেমিক্যাল কোম্পানির নামে হলুদ, মরিচ ও ধনিয়া গুঁড়ার অনুমোদন নেন সোহেল আহমদ।

তিনি ওই কোম্পানির ম্যানেজার। পরে নাম পরিবর্তন করে ‘মা কোম্পানি’ করা হয়। বিএসটিআই শুধু ওই তিনটি পণ্য বাজারজাত করার অনুমোদন দিয়েছিল, তবে মান নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় পরে সেটিও বাতিল করা হয়। কোম্পানিটি দু’মাস বন্ধ রয়েছে।

কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট সিলেটের রাজস্ব কর্মকর্তা সুদীপ্ত শেখর দাস যুগান্তরকে জানান, মা কেমিক্যাল কোম্পানি বছরে ১৫-২০ হাজার টাকা রাজস্ব দিয়েছে। বর্তমানে কোম্পানিটি বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

অথচ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মা কোম্পানির সব পণ্যে সিলেটের বাজার সয়লাব। গত সপ্তাহে সর্বশেষ পর্যবেক্ষণেও এসব পণ্য বাজারে পাওয়া গেছে। বাজার থেকে সংগ্রহ করা এসব পণ্যের নমুনা যুগান্তরের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

সিলেট সিটির ৮নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ কুশিঘাটে ২৫৪নং ডুপ্লেক্স আলী হোসেন সরকার ভবন। বাড়ির নামফলকে লেখা- দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়ার সম্পাদক ও প্রকাশকের বাসভবন। স্থানীয়রা জানান, ‘রমু পীর’ নামের এক ব্যক্তির ওই জমি দখল করে বাড়িটি নির্মাণ করেন আলী। এ বাড়িতেও চলে ভেজাল পণ্যের উৎপাদন ও প্যাকেটজাত কার্যক্রম। খোজারখলায় তার গুদাম রয়েছে।

পলিথিন আলী নিজে ব্যবহার করেন সাদা রঙের প্রাডো গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঘ ১১-২৮৮১)। এছাড়া পণ্য পরিবহনের জন্য রয়েছে কয়েকটি প্রাইভেট কার, সিএনজি ও মোটরসাইকেল। সবটির সামনে দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়ার স্টিকার লাগানো।

বর্তমানে নগরীর কালীঘাটের আমজাদ আলী রোডের আল ফাত্তাহ ম্যানশনে রয়েছে দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়া ও মা কোম্পানির অফিস। মা কোম্পানির সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে- ‘আন্তর্জাতিক সরকার অনুমোদিত’! পাশেই মেসার্স সোনালী স্টোর। সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে- ‘আমদানি ও রফতানিকারক মা কোম্পানির বিভাগীয় ডিপো সোনালী স্টোর।’

দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়ার (রেজি নং-৭১, ডিএফপি নং-৬৪৫৭) প্রিন্টার্স লাইনে ঠিকানা লেখা-৫২/২ টয়েনবী সার্কুলার রোড (মামুন ম্যানশন, গ্রাউন্ড ফ্লোর), ওয়ারীর বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। প্রধান কার্যালয় : নোয়াখালী টাওয়ার, ৫৫/বি পুরানা পল্টন (১৭ তলা), ঢাকা।

সরেজমিন রাজধানীর ওয়ারীর বিএস প্রিন্টিং প্রেসে গিয়ে তাদের ছাপা পত্রিকার তালিকায় দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়ার নাম পাওয়া যায়নি। গত শনিবার বিএস প্রিন্টিং প্রেসের মালিক শাহজাহান মিয়া যুগান্তরকে জানান, দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়া নামে কোনো পত্রিকা আমরা ছাপি না।

দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়ার প্রধান কার্যালয় ৫৫/বি পুরানা পল্টন, নোয়াখালী টাওয়ারের ১৭ তলায় গিয়ে দেখা যায়, ফ্লোরজুড়ে পারফেক্ট গ্র“পের অফিস। দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়ার অফিসের ব্যাপারে জানতে চাইলে দায়িত্বরত কেয়ারটেকার জানান, দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়ার মালিক আমাদের মালিকের বন্ধু। সেই খাতিরে তিনি আমাদের টাওয়ারের ঠিকানা ব্যবহার করছেন। আসলে এখানে কোনো পত্রিকা অফিস নেই।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের লাইসেন্সের ব্যাপারে জানতে চাইলে ২৬ ডিসেম্বর শিল্প সচিব মো. আবদুল হালিম যুগান্তরকে জানান, শিল্প মন্ত্রণালয় কোনো কোম্পানির বা পণ্যের লাইসেন্স দেয় না। যদি কোনো কোম্পানি এভাবে মন্ত্রণালয়ের নাম ব্যবহার করে, তাহলে ওই কোম্পানি মিথ্যা বলছে এবং জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। প্রতারক কোনো কোম্পানির ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে, ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে বলব। অন্যদিকে বিএসটিআই ঢাকা অফিস সূত্র বলছে, এ নামে কোনো কোম্পানিকে তারা পণ্যের গুণগতমানের লাইসেন্স দেয়নি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মা কোম্পানির এমডি এবং দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়ার প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক আলী হোসেন সরকার সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এসব পুরনো কাহিনী। আমার বিরুদ্ধে একটি কুচক্রী মহলের অপপ্রচার। কী আছে, না নাই- অফিসে এসে দেখে যান।

কোম্পানির লাইসেন্স ও পত্রিকার অফিস সঠিক রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে আলী বলেন, ‘আমি কোনো গুণ্ডা-মস্তান নই যে, জায়গা দখল করে বাড়ি বানামু।’ আওয়ামী লীগের ওই শীর্ষ নেতার ভাতিজিজামাই পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, কোম্পানি তিন মাস বন্ধ ছিল। পরে চালু করে জানুয়ারির দিকে চিঠি দিয়ে সবাইকে জানিয়েছি। রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয় জানিয়ে আলী হোসেন বলেন, ব্যবসায় লসে আছি।

ব্যাংকের লোন নিয়ে ঝামেলায় আছি। অন্যদিকে সাংবাদিকরা ভুয়া সংবাদ প্রকাশ করে পাগল করে দিচ্ছে। ভুয়া কেউ কিছু লিখলে অবশ্যই মামলা করব, আপনি লিখলে আপনার বিরুদ্ধেও করব। এদিকে বিসিকের ৫৯নং প্লটের কথা কোথায় উল্লেখ করেছেন নিজেও জানেন না তিনি। এস-৯ প্লট ভাড়া নিয়েছেন বলে দাবি করেন আলী।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ ওই নেতার বক্তব্য জানতে রোববার সন্ধ্যায় কয়েকবার মোবাইল ফোনে চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) জেদান আল মুসা যুগান্তরকে বলেন, আমার জানামতে এসব কাজের সঙ্গে পুলিশ জড়িত নয়। যদি কারও জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়, অবশ্যই তার বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *