বাকশাল হলে দেশ আগেই বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে থাকত

Posted by

বাকশাল থাকলে বাংলাদেশ আগেই বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে থাকতো বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, কৃষক-শ্রমিকসহ দেশের উন্নয়নের জন্য বাকশাল গঠন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশ স্বাধীনের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সাজিয়ে দিয়ে গেছেন। কিভাবে দেশ এগিয়ে যাবে, তা ঠিক করে দিয়েছিলেন। জাতির পিতা যে কর্মসূচিগুলোর ঘোষণা দিয়েছিলেন, এগুলো যদি তিনি বাস্তবায়ন করে যেতে পারতেন তাহলে বাংলাদেশে অনেক আগেই বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন হতো। গতকাল গণভবনে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ছাত্রলীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ সব কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের পথে অনেক দালাল ছিল, যারা পাকিস্তানপ্রেমী ছিল, তারা বাংলার মানুষের ভালো চায়নি। তাদের একাত্তরের ভূমিকা সবার জানা। তাদের বিচার জাতির পিতা শুরু করেছিলেন। তিনি বেঁচে থাকলে ১০ বছরের মধ্যে উন্নত ক্ষুধামুক্ত সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে উঠতো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ অনেকে বাকশাল-বাকশাল বলে গালি দেয়, আসলে বাকশালটা কী ছিলো? এটা ছিলো কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। এই বাংলাদেশ ছিলো কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খাদ্য উৎপাদন করে আর শ্রমিকের শ্রমের মধ্য দিয়ে এদেশের অর্থনীতি গড়ে ওঠে। এই কৃষক-শ্রমিককে এক করে সমগ্র বাংলাদেশকে ঐক্যবদ্ধ করে অর্থনৈতিক মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে ১৯টি জেলা ছিলো। এই ১৯টি জেলাকে ভাগ করে তিনি ৬০টি জেলায় রূপান্তর করেন। তার মানে প্রতিটি মহকুমা পর্যায়ক্রমে জেলায় রূপান্তর করা হয়। এই মহাকুমাগুলোকে জেলায় রূপান্তর করা হয় যেন, সেগুলো অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে ওঠে এবং তৃণমূলের মানুষ সেটার সুফল পায়। সে পদক্ষেপ বঙ্গবন্ধু নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে-ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণ করে একদম তৃণমূল পর্যন্ত যেন পৌঁছে যায় সে ব্যবস্থা করেছিলেন। একজন সাধারণ মানুষ তার যেন বলার সুযোগ থাকে, কাজ করার সুযোগ থাকে; সে পদ্ধতি তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন। যারা জমিতে শ্রম দিবে তারা উৎপাদিত পণ্যের একটি অংশ পাবে, যারা জমির মালিক তারা একটা অংশ পাবে এবং কো-অপারেটিভের মাধ্যমে সরকারের কাছে একটা অংশ আসবে। যেন কখনো কেউ বঞ্চিত না হয়। অন্তত যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জমিতে ফসল ফলায় তারা যেন ন্যায্য মূল্য পায়, তারা যেন ভালোভাবে বাঁচতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের কৃষি পদ্ধতিকে যান্ত্রিকীকরণ করে আধুনিকীকরণ করার কথাই বঙ্গবন্ধুর বলেছিলেন। সাথে সাথে শিক্ষাকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। প্রাইমারী শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছিলেন। উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি বিশেষ সুযোগের ব্যবস্থা এবং নীতিমালা প্রণয়ন করেছিলেন। সকল শ্রেণী পেশার মানুষ যেন সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে, তিনি সে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। প্রত্যেক ইউনিয়নে ১০ বেডের হাসপাতাল করে প্রত্যেকের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেয়ার কাজ তিনি শুরু করেছিলেন। জাতির পিতা যে কর্মসূচিগুলোর ঘোষণা দিয়েছিলেন, এগুলো যদি তিনি বাস্তবায়ন করে যেতে পারতেন তাহলে বাংলাদেশে অনেক আগেই বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন হতো।
স্বাধীনতাপূর্বের ছাত্রলীগের কর্মকান্ড এবং মায়ের স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর পাশে আমার মা সবসময় ছিলেন। মা প্রকাশ্যে রাজনীতিতে আসেননি, ছবি তোলেনি, নাম ছাপেননি। বাবার সঙ্গে থেকে প্রতিটি কাজে সহায়তা করেছেন। সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন। বছরের পর বছর বাবা যখন কারাগারে, মা অপেক্ষা করেছেন। পাশে থেকে সহযোগিতাও করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন কিভাবে করতে হয়, কিভাবে সফল করতে হয়, আমি যদি কিছু শিখে থাকি তা আমার মায়ের কাছ থেকেই শিখেছি।

বাবা যখনই আন্দোলন সংগ্রাম করতেন, তখনই কারাগারে। কারাগারে যখন আমরা বাবার সাথে দেখা করতাম, তখন মা একবারও কোন হতাশার কথা বলেনি, কখনই বলেনি কিভাবে সংসার চালাবো। বাবা যখন জেলে ছিলেন, তখন এই ছাত্রলীগ আমার মা পরিচালনা করেছেন। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সকল নির্দেশনা আমার মা-ই দিতেন। তারা সব সময় আলাদাভাবে আসতেন, মায়ের কাছে পরামর্শ নিতেন। যখন দেশের পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যেত, নেতাকর্মীরা আসতে পারতো না, তখন তিনি (মা) নিজেই ছদ্মবেশ ধারন করে তাদের সাথে দেখা করে বাবার দেয়া নির্দেশনা দিয়ে আসতেন। তিনি ছিলেন সবচেয়ে বড় গেরিলা। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা গোয়েন্দা সংস্থার লোক থাকতো। তারা কোনোদিন ধরতে পারেনি আমার মা কোথায় কীভাবে যাচ্ছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ সম্পর্কে জানতে হলে তাকে নিয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের লেখাপড়া করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা বই অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা বের করা হয়েছে। তার আদর্শ সম্পর্কে জানতে হলে তার লেখা বইগুলো পড়তে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা গোয়েন্দা নথির বঙ্গবন্ধু বই বের করেছি। আরও একটা নতুন খন্ড বের করার কাজ চলছে। আমি বিশ বছর ধরে এই রিপোর্টগুলো নিয়ে কাজ করেছি। আমার সঙ্গে কাজ করেছে আমার বান্ধবী বেবি মওদুদ। কিন্তু দুঃখের বিষয় বেবী মওদুদ আমাদের মাঝে আর নেই। তিনি বলেন, ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই রিপোর্টগুলো তৈরি করা। এই রিপোর্টগুলো তার (বঙ্গবন্ধু) বিরুদ্ধে। এইগুলো পড়লেই বোঝা যাবে দেশের মানুষ, দেশের জন্য বঙ্গবন্ধু কীভাবে কাজ করে গেছেন। এই রিপোর্টগুলো পড়লে তার সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য জানা যাবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর কোনো নেতার বিরুদ্ধে লেখা রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি। আমি যখন রিপোর্টটা সংগ্রহ করি প্রায় ৪০ হাজারের ওপরে পাতা। এর ভেতর যে তথ্যগুলো সেখান থেকে শেখ মুজিব সম্পর্কে জানা যাবে তিনি কীভাবে দেশের জন্য কাজ করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর আরেকটি বই বের হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আরেকটি বই ছাপাতে দিয়েছি। তিনি ১৯৫২ সালে চীনে গিয়েছিলেন। সেখানে তখন একটা শান্তি সম্মেলন হয়েছিল। পুরো পাকিস্তান থেকে একটি প্রতিনিধি দল গিয়েছিল। সেখানে তিনি ভ্রমণ করে নিজের অভিজ্ঞতা লিখেছিলেন। কীভাবে তারা রেভুলেশন করেছে, সেখানকার মানুষের দুরবস্থা, তাদের জীবনযাত্রাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। তাদের দেখেছেন, তাদের নিয়ে লিখেছেন।

ছাত্রলীগের ইতিহাস প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের প্রতিটি সংগ্রামে ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততা রয়েছে। প্রতিটি ইতিহাসে ছাত্রলীগের নাম রয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামে অনেক ছাত্রলীগ নেতা প্রাণ দিয়েছেন। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নীতি-আদর্শ না থাকলে নেতা হওয়া যায় না। নেতা হওয়া গেলেও তা সাময়িক। নীতিহীন নেতৃত্ব দেশকে কিছু দিতে পারে না। মানুষের ভালোবাসা-আস্থা অর্জন করতে হবে। নীতিই রাজনীতিকের জীবনের একমাত্র সম্পদ।

শোককে শক্তিদের পরিণত করে কাজ করার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, শোককে বুকে নিয়ে, ব্যথা-বেদনা বুকে চেপে রেখে নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করেছি আমরা। ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া রাখিনি। যে জাতির জন্য বাবা জীবন দিয়ে গেছেন, তার জন্য কতটুকু করতে পেরেছি, সেই বিবেচনা করেছি। যদি নিজেকে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে হয় তাহলে তার মতো ত্যাগী কর্মী হিসেবে দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু যাদের ভালোবাসতেন তাদের কল্যাণ করা সন্তান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। ধামনন্ডির ৩২ নম্বরে যখন বাবাকে হত্যা করা হয়, খুনিরা মাকে বলেছিল, চলেন। তিনি একপাও নড়তে রাজি হননি, জীবন ভিক্ষা চাননি। বীরের মতো বুক পেতে দিয়েছিলেন বুলেটের সামনে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বড় সন্তান হিসেবে বাবার স্বপ্ন, লক্ষ্য আমি জানতাম। সেগুলো সামনে নিয়েই আমার পথচলার শুরু। স্বাধীনতার পর অনেকেই বলেছিল, এদেশের কোনও ভবিষ্যৎ নেই, ব্যর্থ রাষ্ট্র হবে। আমার জেদ ছিল বাংলাদেশকে এমনভাবে গড়ে তুলব যাতে বিশ্ববাসী বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে দেখে!

গতকাল সকাল থেকেই উৎসাহী নেতাকর্মীরা গণভবনের সামনে হাজির হতে থাকেন। বিকালে আলোচনার সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে ছাত্রলীগের সাফল্যের নানা কর্মকান্ড তুলে ধরা হয়। দেখানো হয় ছাত্রলীগের কর্মীদের বানানো মোবাইল গেমের প্রোমো। এসময় সঞ্চালক ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ছাত্রলীগের নিউজ পোর্টাল বিএসএল নিউজের বিষয়ে অবহিত করেন। তিনি জানান, আগামীতে সারাদেশে ১১০টি সাংগঠনিক ইউনিটের সামাজিক রাজনৈতিক কর্মকান্ড বিবেচনা করে ‘বেস্ট ইউনিট অব দ্য মান্থ’ ও ‘বেস্ট অ্যাক্টিভিস্ট অব দ্য মান্থ’ পুরস্কার ঘোষণা দেয়া হবে।

আলোচনা সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস, সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন, ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সভাপতি মো. ইব্রাহিম, সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান হৃদয়, ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি মেহেদী হাসান, সাধারণ সম্পাদক জোবায়ের আহমেদ প্রমুখ।
ইনকিলাব